ব্যক্তির বাজেট, রাষ্ট্রের বাজেট

অনলাইন ডেস্কঃ

বাজেট। শব্দটা শুনলে মনে হয় যেন মূল্যবৃদ্ধির আয়োজন। টানাপোড়েনের বিষয়। প্রত্যাশার বিষয়ও বটে। তবে বাংলাদেশের এবারকার বাজেট আসছে একটা অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যদিয়ে। এই অস্থিরতা সর্বত্রই — সারা বিশ্বে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন আগামী ৯ জুন। বাজেট অত্যন্ত জরুরি বিষয় — এটি একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দলিল। সুতরাং বাজেট বিষয়ে একটা পরিষ্কার ধারণা সবার থাকা দরকার।

ফরাসি শব্দ ‘B o u g e t t e’ থেকে ‘বাজেট’ শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ ’চামড়ার ব্রিফকেস’ বা ‘টাকার থলে’। বাংলা ভাষায় একুশ শতকের শুরুর দিকে ১৯০২ সালে ‘বাজেট’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও বাংলাদেশর সংবিধানে ‘বাজেট’ শব্দটির পরিবর্তে ’বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ ব্যবহার করা হয়েছে।

ঐতিহ্যগতভাবে, বাজেটে কাগজপত্র বা নথি, যার মধ্যে প্রাথমিকভাবে রাজস্ব প্রাপ্তি এবং ব্যয় সম্পর্কিত কাগজপত্রের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। বাজেটে কাগজপত্র বা নথি এবং বক্তব্যের কপি বাদামি কিংবা কালো বিফ্রকেসে করে সংসদে নিয়ে আসেন অর্থমন্ত্রী। মূলত এটি ব্রিটিশদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি চর্চা।


বাজেট পরিকল্পনা আমরা ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও করে থাকি। কারণ বাজেট হলো আয়-ব্যয়ের হিসাব। পরিকল্পনা ছাড়া আয়-ব্যয় সামাল দেয়া যায় না। যে কোনো পরিবারের কর্তা মোটামুটি একটা বার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে তার সংসার চালান। সেটা তার মাথায় থাকে। তিনি হতে পারেন ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী। তিনি তার সম্ভাব্য উপার্জনের অংকটি মাথায় রেখে সারা বছরের একটা ছক এঁকে নেন। কোথা থেকে কত আয় হবে এবং ব্যয়ের খাতগুলো কী কী, সেগুলো ঠিক করেন। অর্থের ঘাটতি হলে সেটা কীভাবে যোগাড় করবেন সেসব বিষয় ভেবে রাখেন।

একটি পরিবারেরও রাষ্ট্রের ন্যায় বিভিন্ন ধরনের খাত থাকে। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে- খাদ্য, স্বাস্থ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও বিনোদন। মূলত খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থের আয়োজন করতে হয়। মাঝে মাঝে দেখা যায়, বছরে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে বলে উপার্জনকারী অনুমান করেছিলেন ততটুকু ব্যয় হয়নি, কিছুটা বেঁচে গেছে। সেই উদ্বৃত্ত অর্থটুকু থেকে তিনি অন্যান্য প্রয়োজনে খরচ করেন।

আবার মাঝে মাঝে দেখা যায়, তিনি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে বলে অনুমান করছিলেন, তার থেকে বেশি ব্যয় হয়ে গেছে। সে সময় তিনি ব্যয় মেটাতে তার হয়তো এক খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করতে হয় অথবা ঋণ করেন। ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের উৎস হচ্ছে- নিকট আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী অথবা ব্যাংক। এ অর্থ পরে আয়ের বিভিন্ন খাত থেকে ক্রমান্বয়ে পরিশোধ করতে হয়।
অনেকটা পরিবারের মতো করেই, রাষ্ট্র সারা বছরের ব্যয় নির্বাহের জন্য শুরুতেই পরিকল্পনা করে কতটুকু আয় হবে এবং কতটুকু ব্যয় হবে। সরকার কোনো একটি নির্দিষ্ট আর্থিক বছরের বিভিন্ন উৎস থেকে কী পরিমাণ আয় হবে এবং বিভিন্ন খাতে কী পরিমাণ ব্যয় করতে চায়, তার বিস্তারিত হিসাবকেই সরকারি বাজেট বলে। এক কথায়, একটি দেশের সম্ভাব্য সব আয়-ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণই হচ্ছে বাজেট। এছাড়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকারের ব্যয় ও রাজস্বের পূর্বাভাসও বটে।

ব্যক্তির বাজেটের সঙ্গে রাষ্ট্রের বাজেটের মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে- ব্যক্তি আগে আয় করে তারপর খরচ করে। অপর দিকে রাষ্ট্র আগে ব্যয় করে তারপর অর্থের আয়োজন করে। বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয় ও রাজস্ব ব্যয়ের হিসাব প্রতিফলিত হয়, যাকে রাজস্ব বাজেট বলা হয়।
আয় ও ব্যয়ের ধরনের ভিত্তিতে এ রাজস্ব বাজেটের প্রধান দুটি অংশ থাকে। রাষ্ট্রেও পরিবারের মতো আয়ের উৎস রয়েছে। কারণ ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের অর্থ প্রয়োজন। রাষ্ট্রে বেশ কিছু আয়ের উৎসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়- প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর এবং কর বহির্ভূত আয়।

প্রত্যক্ষ করের আওতায় পড়ে ব্যক্তি আয়কর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়কর বা করপোরেট কর, যানবাহন কর, মাদক শুল্ক, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি। সরকারের আয়ের অন্যতম উৎস জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর আদায়ের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের মোট বাজেটের ৫৫ শতাংশ অর্থ জোগান দেয়ার কথা। পরোক্ষ করের মধ্যে রয়েছে- আমদানি কর, আবগারি শুল্ক, ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক ইত্যাদি।

এছাড়া করবহির্ভূত আয়ের মধ্যে রয়েছে, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ, সুদ, সাধারণ প্রশাসন থেকে আয়, ডাক-তার-টেলিফোন থেকে আয়, পরিবহন আয়, ভোক্তা অধিকারের মতো প্রতিষ্ঠানের করা জরিমানা থেকে আয়, ভাড়া, ইজারা, টোল ইত্যাদি। সরকার বছরের শুরুতেই বাজেটে অনুমান করেন কী পরিমাণ অর্থ এ তিন উৎস থেকে সরকারের কোষাগারে জমা হবে। আসন্ন বাজেটের জন্য সরকারের আয় অর্থাৎ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের ধারণা, এসব উৎস থেকে উল্লেখিত পরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে।

বাজেটেই পরিকল্পনা করা হয় আমদানি শুল্ক কতটুকু হবে, কোন খাতে কী পরিমাণে ভ্যাট পড়বে, করপোরেট ট্যাক্স কত হবে বা মাদক শুল্ক কতটুকু আরোপ করা হবে। তাই তো ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা সরকার তাদের কথা বিবেচনা করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের করের পরিমাণ নির্ধারণ করবে। এদিকে সাধারণ মানুষ জিনিসপত্রের দাম কমার জন্য সরকারের উদ্যোগের অপেক্ষায় থাকেন।

বাজেটের আরেকটি অংশ হচ্ছে রাজস্ব ব্যয়- এটি হচ্ছে সরকার পরিচালনার ব্যয় বা যাবতীয় ব্যয়। এ ব্যয়কে অনুন্নয়ন বাজেটও বলা হয়। অনুন্নয়ন বাজেট তিন ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলো হচ্ছে- দেশরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসন চালোনোর খরচ।
এ ছাড়া নানা ধরনের সামাজিক কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হয়। পাশাপাশি কৃষি, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্যের মতো খাতে সরকারের ভর্তুকি দিতে হয়। এদিকে সরকারের সুদ পরিশোধের অংশটি এ ব্যয়ের অওতাভুক্ত। তবে সরকার পরিচালনার অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রদান সরকারের ব্যয়ের বড় একটি খাত।

দেশ পরিচালনায় যত ধরনের খরচ রয়েছে, তা পূরণের পর বাকি অর্থ দিয়ে সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে। এর জন্য উন্নয়ন বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। রাস্তা-ঘাট, সেতু নির্মাণ, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল নির্মাণসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়।

মূলত রাজস্ব উদ্বৃত্তের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তর ও বাহ্যিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে উন্নয়ন বাজেট তৈরি করে সরকার। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নামেও একটি প্রকল্প খাত রয়েছে। সাধারণ এডিপিতেই উন্নয়ন বাজেটের ব্যয় দেখানো হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে এডিপি জন্য ২ লাখ ৭৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। এছাড়া ভর্তুকি ও প্রণোদনাতে ৭২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করতে চায় সরকার।

তাছাড়া সরকারের অন্যান্য খাতের মধ্যে রয়েছে, সামাজিক অবকাঠামো, মানবসম্পদ, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও প্রযুক্তি গবেষণা, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, কৃষি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তৈরি পোশাক খাত ইত্যাদি।

এসব খাতের ব্যয়ের জন্য আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। যেহেতু সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা  ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, সেহেতু আসন্ন বাজেটে আয়-ব্যয়ের হিসাবে ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়! এ ঘাটতি রাষ্ট্র কীভাবে পূরণ করবে। এক্ষেত্রে সরকারে দুটি উৎস রয়েছে। প্রথমত, বৈদেশিক উৎস। ঘাটতি পূরণ করতে সরকার বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থা থেকে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে থাকে। যেমন- বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইত্যাদি। এসব উৎস থেকে কম সুদ হারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধ করা গেলেও অনেক বেশি শর্ত মেনে নিতে হয় সরকারকে। সরকারের আরেকটি উৎস হচ্ছে অভ্যন্তরীণ উৎস। এক্ষেত্রে সরকার দুইভাবে ঋণ নেয়। ব্যাংক এবং ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা। ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা।

এর মাধ্যমে সরকার সাধারণ মানুষ থেকে ঋণ নেয়। তবে এ উৎস থেকে ঋণ নিলে ঝামেলা বেশি। কারণ সরকার দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিলে দেশের বেসরকারি খাতের অর্থ কমে যায়। ফলে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিলে সুদ দিতে হব বেশি। ফলে পরের বাজেটের জন্য সুদ পরিশোধ খাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়।

এছাড়া সরকার বেশি পরিমাণ ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতিওতে প্রভাব পড়ে। সুতরাং এক্ষেত্রে সরকারকে সচেতন হতে হয়। কেননা, বাজারে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে সবপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশে রাখার পরিকল্পনা করে সরকার।